ধ্রুব তারার গল্প

0
549
Polaris- The North Star- Alpha Ursa Minor Canon Rebel XSi + 5" scope 1/22/09 400 ISO for 5 minutes
টাপুর টুপুর ঠাম্মার কাছে বসেছে গল্প শোনার জন্য। বাইতে বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছে। রবিবার দুই নাতি-নাতনি ঠাম্মাকে ধরে বসেছে ‘গল্প বলো’।
ঠাম্মা বললেন, ‘বেশ তবে শোন’।
সে আনেকদিন আগের কথা, এক রাজার দুই রানি ছিল সুমতি আর সুরুচি। কোনও কারণে রাজা সুমতির উপর খুব রেগে গেলেন। তাকে পাঠিয়ে দিলেন বনে। সেখানে কুঁড়ে ঘরে সমতি তার ছেলে ধ্রুবকে নিয়ে বাস করত। 
সুরুচি রাজার পাটরানি। রাজপ্রাসাদে থাকে কত দাস দাসী কত হীরে, জহরত, গয়না। রুপোর থালা সোনার বাটিতে ভাত খান রানি। রাজা খুব যত্ন করেন। সুরুচি খুব সুখী। তার ছেলে উত্তম পরবর্তী রাজা হবে। একদিন ধ্রুব যখন পাঁচ বছরের বালক সে তার মাকে জিজ্ঞেস করল তার বাবা কোথায় থাকেন। 
সুমতি বললেন। তোমার বাবা রাজা উত্তানপাদ। এই রাজ্য তাঁর অধীন তুমি নিশ্চিন্তে তোমার বাবার কাছে যাও। ধ্রুব জঙ্গল পেরিয়ে রাজপ্রাসাদে গিয়ে পৌঁছাল তখন রাজা উত্তানপাদ সিংহাসনে বসেছিলেন। ছোট্ট ধ্রুবকে দেখে অতন্ত খুশি হলেন এবং হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিতে গেলেন। সেই সময় রানি সুরুচি খবর পেয়ে ছেলে উত্তমকে নিয়ে হাজির। রাজাকে বললেন, ধ্রুব নয়, উত্তমকেই তাঁকে কোলে নিতে হবে এবং পরবর্তী রাজা হবে উত্তম। রাজা ধ্রুবকে কোলে নিতে পারলেন না। ধ্রুব মনের দুঃখে তার মার কাছে ফিরে এল। তার দুঃখী মুখ দেখে তার মা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন-
বাছা ধ্রুব, তুমি কি খুব মনে কষ্ট পেয়েছ?
ধ্রুবর কথা শুনে তিনি বললেন- সামান্য রাজত্বের রাজা হয়ে তুমি কতটুকু আর বড় হবে? তার চেয়ে এমন কিছু কর যাতে তোমাকে সবাই সব সময়ই স্মরণ করবে। তুমি সকলের বড় হবে। এই কথা শুনে মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধ্রুব গভীর জঙ্গলে এল এবং তপস্যার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হল। এই বনে ব্রহ্মার মানসপুত্র সপ্তঋষির সঙ্গে দেখা হল । তাঁরা ব্রহ্মার স্তব করছিলেন। ঋষিদের প্রণাম জানাতে তাঁরা আশীর্বাদ করে তার বনে আসার কারণ জানতে চাইলেন। ধ্রুব বলল, হে মুনি শ্রষ্ঠাগণ, অর্থ বা রাজ্যের প্রতি আমার লোভ নেই। আমি সেই স্থান পেতে চাই যে স্থানের অধিকার এখনও পর্যন্ত কেউ পায়নি। তাই আমি কি ভাবে সেই স্থানে অধিকারী হব তাই যদি বলেন দেন।
তখন সাত ঋষি অঙ্গীরা, মরীচি, আত্রি, পুলস্ত, পুলহ, ক্রুতু ও বশিষ্ট এই সাত ঋষি কিভাবে বিষ্ণুর ধ্যান করতে হয় শিখিয়ে দিলেন। এবং বললেন, বিষ্ণুর ধ্যান করতে হলে পৃথিবীর সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে চিন্তা ছাড়তে হবে। তারপর সেই চিন্তাকে বিষ্ণুর চিন্তায় একাগ্র করে জপ করতে হবে।
ধ্রুবর একাগ্র চিত্তে ধ্যান করা ভেঙে দেওয়ার জন্য তাকে প্রলোভন ও ভয় দেখান হল কিন্তু ধ্রুব কোনও কিছুতেই বিচলিত হলো না। তার বিষ্ণুর ধ্যান ভাঙার সাহস কারো হল না।
তখন ভগবান বিষ্ণু দেখা দিয়ে বললেন, সমস্ত রাজ্য বিষয় মন থেকে সরিয়ে একাগ্রচিত্ত হয়ে আমাকেই ধ্যান করেছ। আমি প্রসন্ন হয়েছি, কি বর চাও বল !
ধ্রুব ভগবানকে প্রণাম করে বলল, ‘হে প্রভু, সামান্য রাজ্য ধন আমি কিছুই চাই না, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যে স্থান আমি সেই স্থান প্রার্থনা করি।
বিষ্ণু আশীর্বাদ করে বললেন, তুমি মার আশীসে সর্গ-মর্ত্য-পাতালের থেকেও উচ্চস্থান গ্রহ তারাদের মধ্যে আশ্রয় পাবে এক উজ্জ্বল তারকা হয়ে। তোমার একাগ্রতা স্থিরতা তোমাকে উচ্চ আসনে স্থাপন করেছে। পৃথিবী যতদিন থাকবে সকল দেবতা মানুষ তোমাকে স্মরণ করবে। যা স্থির, চিরসত্য তাই ধ্রুব। তোমার মা সুনীতিও তোমার সঙ্গে তারা হয়ে বিরাজ করবেন। 
সেই থেকে ধ্রুব নক্ষত্রকে আমরা সবসময়ই আকাশের উত্তরদিকে উজ্জ্বল তারা রূপে দেখতে পাই। কম্পাস আবিস্কারের জন্মের আগে জাহাজের নাবিকরা ধ্রুবতারা থেকে দিক ঠিক করত। তোমরা আকাশের উত্তরদিকে তাকালে এখনও ধ্রুবতারাকে দেখতে পাবে একাগ্রচিত্ত ধ্যানমগ্ন।
সুতরাং বুঝতে পারলে দাদুভাই, যে কোনও কাজ যদি একাগ্রতা নিয়ে করা যায় তাহলে সেই কাজে সর্বোচ্চ সম্মান পাবে। এখন চলো সকলের খাবার সময় হল তোমাদের মা ডাকছেন। 

—-কৃষ্ণা গায়েন