জমিদার রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’

0
3078

 কানাইলাল দে  

জমিদার বংশীয়, জমিদার রবীন্দ্রনাথ উচ্চবংশে যার জন্ম তিনি যে বঞ্চিত, উপেক্ষিত নিম্নবর্গীয় ও প্রান্তিক মানুষের কথা বলবেন, গ্রামীণ জীবনে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত দরিদ্র মানুষের কথা সসম্ভ্রমে উল্লেখ করবেন, এটাই বিচিত্র, অকল্পনীয় অভাবনীয়। আজকের সমাজে যাদের ব্রাত্য করে দেখা হয়, তাদের তিনি তাঁর রচনায় স্থান দিয়েছেন, নিম্নবর্গের মানুষদের সার্বিক উল্লেখ করেছেন তার লেখায়; নাম গোত্রহীন নিম্নবর্গীয় মানুষ তাঁর জীবন দর্শনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। মানবতার জয়গান আচন্ডালে প্রেম বিলিয়ে গেয়েছেন, যা তাঁর সমকালীন আর কোনও লেখকের লেখায় লক্ষ্য করা যায় নি। এ ব্যাপারে তিনি পথিকৃত ছিলেন বলা চলে। 
বলছি সহজ পাঠের কথা, এর প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ ছোটদের জন্য লেখা এক অনন্য বই। ‘ছোটদের জন্য লেখা’ এই আগমার্ক থাকলেও অনুধাবন ও বিশ্লেষণে দেখা যায় এটি একটি সমাজদর্পণ বা সমাজের চাল চিত্র। রবীন্দ্রনাথ সুকোশলে সব রকমের সব তথ্য অতি সচেতন ভাবে তুলে ধরেছেন এমন বেশ কিছু চরিত্রকে উপস্থাপিত করেছেন তারা সকলেই নিচ সম্প্রদায়ের মানুষ। সহজপাঠে সমুচিত সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে এদের কথা বলেছেন। কেবল মাত্র উচ্চবিত্ত বা উচ্চধর্মের মানুষজনের গৌন অনুসঙ্গ হিসেবে এই সব নিম্নবর্ণের চরিত্রের উল্লেখ করা হয়। এদের বাদ দিয়ে সমাজের কথা বলা যায় না, একথা ভেবে তারা সমাজের মূল স্রোতের এক গুরুত্ব পূর্ণ অংশ হিসেবে সহজ পাঠে উপস্থিত। এই প্রান্তিক মানুষ জনের প্রান্তিকতাকেই অস্বীকার করার এক সুস্পষ্ট বার্তা রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে উচ্চ শ্রেণির মানুষের আধিপত্য বা কর্তৃত্বকেই যেন চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। 
উত্তবিত্ত বা উচ্চবর্ণের মানুষজনদের কেউ কেউ নিম্নবর্গের মানুষের প্রান্তিকতায় বিশ্বাস করেন না, সমাজে তাদের পদলিত রাখতে চান না বরং গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য নিজস্ব স্থান যাতে তৈরি হয়, সমাজের উঁচু তলায় এই মানুষেরা সে চেষ্টা করেন। যার মধ্য দিয়ে শাসক ও শাসিতের ব্যবধান বা উচ্চবিত্ত ও নিম্নবর্গের মধ্যে বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সমাজের উচ্চ-নিম্ন, ধনী দরিদ্র, অবমন ও উত্তমন বলে কেউ নেই- এ শিক্ষা শিশুকাল হতে শিশুর মনে প্রোথিত করা হলে শিশু এদের মধ্যে বাদ বিচার করবেন না। 
‘সহজ পাঠ’-এর প্রথম ভাগে যখন শিশুদের বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করানো হচ্ছে, তখন এক একটি বর্ণকে ব্যাক্তিত্ব আরোপ করে শিশুমনে তাদের সম্পর্কে সঠিক ও সুস্পষ্ট ধারনা গড়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগ নিচুতলার মানুষ-জেলে, মজুর, চাকি, গাড়োয়ান, চাষি ইত্যাদি।
পাঠের শুরুতে দেখা যাবে এরা পল্লীজীবনের সাথে যুক্ত সাধারণ মানুষ। সেখানে দেখা যায়, খেয়া পারাপার করে মাঝি মধু রায়, চাষ করে কৃষক জয়লাল, ঘাস কাটে যে অবিনাশ। ঘরামির কাজ করে হরিহর, চাষি গুরুদাস, মালি ভোলা, বেণী বৈরাগী-র মত চরিত্রগুলি লক্ষ্য করার বিষয় এই যে প্রত্যেকটি চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ আলাদা আলাদা ভাবে নামকরণ করেছেন। সমাজের একেবারে নীচুতলায় মানূষদের নামগোত্রহীন করে রাখা তাদের প্রান্তিকতাকেই সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস একটি। সেই দৃষ্টি কোন থেকে রবীন্দ্রনাথ হেঁটেছেন উল্টোপথে। প্রত্যেকটি চরিত্রকে আলাদা নাম পরিচয় দিয়ে সমাজে তাদের গুরুত্ব শিশুমনে এঁকে দিতে চিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে একদিকে জমিদার, সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষ জন এবং অপরদিকে সাধারণ দীন দরিদ্র পল্লীবাসীর বর্ননার মধ্যে দিয়ে সমাজের হেজেমানিক গঠনকেই ‘সহজ পাঠ’-এ তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পাশাপাশি যে সংবেদনশীল তার সঙ্গে এই নিম্নবর্গের মানুষের কথা বলেছেন। তাতে এই মানুষগুলির জন্য তাঁর সংবেদী সমাজভাবনারই পরিচয় মেলে। নেজের উচ্চবর্গীয় অবস্থান সত্ত্বেও তাঁর চারপাশের দরিদ্র চাষী প্রজাদের অসহায়তার করা বারে বারে উঠে এসেছে তাঁর লেখায় ‘সহজ পাঠ’ ও তার ব্যাতিক্রম নয়। সমাজের বিভিন্ন কাজকর্মে এই মানুষগুলির যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব থাকে এবং তাদের অস্তিত্ব সমাজের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় । রবীন্দ্রনাথ সহজ পাঠের মধ্যে দিয়ে শিশু মনে এই ছবিই আঁকতে চেয়েছেন। প্রাত্যহিক জীবনে এই চরিত্রগুলির ভূমিকা তৎকালীন সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কর্তৃত্বকেই প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রান্তিক চরিত্রগুলি মুখ্য না হয়ে উঠলেও মুখ্য চরিত্রগুলিরদের উপর নির্ভরতা প্রমান করে সমাজে নিম্নবর্গীয় শ্রেনির অবস্থানের গুরুত্ব। 
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে ১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ পুর্ববঙ্গে জমিদারি দেখভালের জন্য যান। সেখানে কয়েকটি গ্রামে পরিদর্শনে গিয়ে তিনি অবস্থান করেন এবং সেখানে থাকাকালিন গ্রামীন জনজীবন খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এনে দেয়, রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জোড়াসাঁকোর প্রাসাদে অট্টালিকার অভিজ্ঞতা জমিদার বংশে, পুর্ববঙ্গে যাত্রা সে অর্থে নগর জীবন থেকে বেরিয়ে এসে পল্লী জীবন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এনে দেয় রবীন্দ্রনাথকে সেখানে অসংখ্য দরীদ্র শ্রমজীবী গ্রাম বাসির সাথে তাঁর যথাযোগ্য ঘটে। এখানে আসার আগে বস্তুতপক্ষে গ্রামীন জন জীবনের পরিচয় সেভাবে ঘটেনি। এই যোগাযোগ তাঁর মধ্যে জন্ম দিয়েছিল এক নতুন সচেতনতার। তিনি লিখেছেন-
‘এখানকার এই যে সমস্ত নিরক্ষর নির্বোধ চাষার ভুষার দল-
থিণ্ডারিতে আমি তাহাদিগকে অসভ্যবর্বর বলিয়া অবজ্ঞা করি, কিন্তু কাছে আসিয়া প্রকৃতপক্ষে আমি ইহাদিগকে আত্মীয়ের মতো ভালোবাসি এবং ইহাও দেখিয়াছি, আমার অন্তঃকরণ গোপনে ইহাদের প্রতি একটা শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। ‘