পল্টু ডাকাতের হাত থেকে নিস্তার পেতেই শালবনির গ্রামে শুরু হয় শিবের আরাধনা

0
4577

পত্রিকা প্রতিনিধিঃ জঙ্গলাকীর্ণ গ্রাম । সেই গ্রামেই গোমস্তাগিরি করতে আসেন শালবনীর চৈতা গ্রামের লক্ষীনারায়ন দুয়ারী ।  ইংরেজ শাসন । তখন জমিদারিত্ব যায় যায় অবস্থা । তৎকালীন গোদাপিয়াশালের জমিদার শালবনীর দেবগ্রাম মৌজা টি দান করে দেন তারই গোমস্তা লক্ষীনারায়ন বাবু কে । তারপর থেকে তিনই হলেন এখানকার জমিদার । জমিদারের জমিদারিত্ব ছোট । কিন্তু তীক্ষ বুদ্ধিধর ছিলেন এই লক্ষীনারায়ন বাবু । তারই সন্তান রাধাশ্যাম দুয়ারী । তিনি বাবার মতো বুদ্ধি না ধরলেও ইংরেজ আমলেও তার জমিজমা ধরে রাখতে পেরেছিলেন । ইংরেজ দের কে কর দিয়ে যা আয় হতো তাতে সমবছর পরিবার পরিজন দের নিয়ে দিব্য সুখে কাটাতেন । এমন সময় হঠাৎ করে আবির্ভাব ঘটল পল্টু ডাকাতের । কোথা থেকে আসত আর কোথায় যেত কেউ জানতেই পারতো না । তার ভয়ে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী থেকে গোমস্তা পরবর্তী কালে জমিদার হয়ে উঠা লক্ষীনারায়ন দুয়ারী । তার একমাত্র সন্তান রাধাশ্যামের বিয়ে দিয়েছেন অপরুপা সুন্দরী নির্মলার সঙ্গে । পল্টুর নজর যদি একবার নির্মলার উপর পড়ে তাহলে বিপদ ।  পল্টু সন্ধ্যা নামলেই হা রে রে করে ঘোড়ায় চেপে আসত লুঠপাট চালাতে । জনশ্রুতি আছে এই পল্টুর ভয়ে গ্রামের মানুষ সন্ধ্যের আগেই সোনাদানা যা থাকত তা নিয়ে ঘর ছেড়ে অন্য স্থানে আত্মগোপন করে থাকত । অনেকেই বলেন মাঠে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কুঁয়োর মতো করে সেখানেই লুকিয়ে থাকতো । কিন্তু গোমস্তা যদি ছেড়ে পালায় গ্রাম থেকে তাহলে কি হবে ? এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে শিব ভক্ত লক্ষী নারায়ন বাবু বাবা মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করলেন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য । একদিন এমনই এক শিবচুতর্দশীর কয়েক দিন আগেই বাবা মহাদের স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন যে যদি আমার প্রতিমা গড়ে পূজো করিস তাহলেই এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবি । আর আমার মতোই এক সন্তান জন্ম নিবে নির্মলার গর্ভে । সেই বছরই খড় আর মাটি দিয়ে তৈরী হল শিব পূজো । তার কয়েক বছর পরই নির্মলার গর্ভে জন্ম নেই শিবের মতো দেখতে একটি পুত্র । তার নাম দেওয়া হয় গৌউর । আশ্চর্যের বিষয় গৌউরের জন্মের পরের বছর থেকেই পল্টু ডাকাত কোথায় যেন হারিয়ে গেল । হঠাৎ যেমন এসেছিল হঠাৎ চলেও গেল । হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন রাধাশ্যাম বাবু সহ গ্রামবাসীরা । পরে নির্মলার গর্ভে আরো একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন । তারপর রাধাশ্যাম বাবু গত হওয়ার পর এই গোমস্তা গিরির হাল ধরেন গৌউর চন্দ্র দুয়ারী ।
শালবনীর দেবগ্রামের শিব চতুর্দশীতে এই রকমই লৌকিক কথা শোনা যায় । তবে গ্রামের এই পূজোটি একেবারেই এই গোমস্তাদের ছিল না । তারা প্রচলন করলেও গ্রামের সকলেই সহযোগিতা করেন । তখনকার সময়ে গ্রামের আশুতোষ মাহাত পূজোর জন্য জমি দান করেন । রাধাশ্যাম দুয়ারী কে সামনে রেখে দেবগ্রামের বাসিন্দা অতুল কৃষ্ণ সাহা , অতুল কৃষ্ণ বিষই , জানকিনাথ দাস , পঞ্চু মাহাত , গোবর্ধন বিষই , ঘনশ্যাম মাহাত রা এগিয়এর আসেন । ভয় থেকে আসে শ্রদ্ধা , আর পল্টুর ভয়ে সকলেই একত্রিত হয় মহাদেবের । শুরু হল পূজো ।
প্রথম প্রথম অস্থায়ী মন্ডপ করে পূজো হতো । শিব দুর্গার পাশে দুই দাসি । বাধ্য হাত জোড়ো করে শিবদুর্গার পদতলে । আর সবার উপরে স্বয়ং নারায়ন আশির্বাদ করছেন এই কাঠামোয় প্রতিমা তৈরী হয় ও পূজো হয় ।
গ্রামের মানুষ দেখেন এই পূজোটি শুধুমাত্র গোমস্তা দের মধ্যে না রেখে গ্রাম বাসীদের সকলকেই সমবেত করতে হবে । তাই কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামের বাসিন্দারা সকলেই পূজোর জন্য অর্থ সাহায্য করতো এবং প্রতিমার খরচ দিতেন গোমস্তারা ।
গ্রামেও তেমন কিছু পূজো ছিল না । তাই গ্রামের মানুষ সকলেই মেতে উঠলেন এই শিবপূজো কে কেন্দ্র করে । ধীরে ধীরে তৈরী হয় স্থায়ী মন্ডপ , আটচালা । পূজোকে সচল রাখার জন্য অর্জুন মন্ডল সহ কয়েক জন জমি দান করেন যা বর্তমানে দেবোত্তর সম্পত্তি নামে উল্লিখিত । পূজো কে কেন্দ্র করে শুরু হয় মেলা । আগে প্রায় দশ দিন ধরে মেলা চলতো । বর্তমানে কমে কমে সাত দিনে দাঁড়িয়েছে ।
এই বছর দেবগ্রামের শিবপূজো ৮৬ বছরে পড়লো । বর্তমান পূজো কমিটির সম্পাদক সমীর দাস বলেন , এই বছর সাতদিন ব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে , যাত্রা , হরিনাম সহ সঙ্গিতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে । খরচ হচ্ছে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা ।
এই মেলা কে কেন্দ্র করে আগে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসতো । বর্তমানে তার কিছুটা খামতি লক্ষ করা যায় ।

গোমস্তারাও আর আসেন না পূজোতে । শেষ গোমস্তা গৌউর দুয়ারী গত হওয়ার পর তার একমাত্র সন্তান রামকৃষ্ণ দুয়ারী বলেন , দাদু এবং দাদুর বাবা এই পূজো শুরু করেন । পরে বাবার আমলের শেষ দিক থেকেই গ্রামের মানুষ পূজোর দায়ভার সব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেয় । ফলে এখন আমরা আর পূজোর প্রতিমাও দিয় না । শেষ দিকে আর্থিক অবস্থাও তলানি তে ঠেকে । বাবা গত হওয়ার পর থেকে আমরা আর ওই পূজোর সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক রাকি না বা পূজোর সময় প্রথম প্রহরের পূজো হত আমাদের নামে তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে ।

তবে গোমাস্তা দুয়ারীরা আর যোগাযোগ না রাখলেও বা গ্রামের মানুষ তাদের প্রতিমা না নিলেও এই শিব পূজোর ঢাকের আওয়াজ কিন্তু বার বার মনে করিয়ে দেয় সেই গৌউর দুয়ারীদের কথা ।